ছবি:বিজয় ২১ নিউজ
সোনাতলা (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার পদ্মপাড়া লুৎফর রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নয়নকাজ সম্পূর্ণ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ে একটি লোহার গেট ও একটি গ্রিল স্থাপনের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বিল পরিশোধের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হয়ে একই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিল উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকল্পের কাজের বাস্তব অগ্রগতি, কাজ সম্পন্নের তারিখ এবং বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজের দায়িত্ব পাওয়া মন্ডল এন্টারপ্রাইজ নিজে কাজ না করে পাকুল্লা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শরিফুল ইসলামের কাছে কাজটি হস্তান্তর করে। পরে কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিল উত্তোলন করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা জামানত জমা থাকায় অসম্পূর্ণ কাজ পরবর্তীতে সম্পন্ন করা সম্ভব।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফ্যাসিলিটিজ-সংক্রান্ত উন্নয়নকাজের আওতায় বিদ্যালয়ে লোহার গেট ও গ্রিলসহ বিভিন্ন কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু একটি গেট ও একটি গ্রিল এখনো স্থাপন করা হয়নি। কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় ঠিকাদারের বিল উত্তোলন এবং প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলিম বলেন, সব কাজ শেষ হয়েছে। শুধু একটি গ্রিলের কাজ বাকি রয়েছে। ঠিকাদার দোকানে টাকা বাকি রাখার কারণে গ্রিল তৈরি করা হয়নি। কাছাকাছি একটি দোকানে গ্রিলের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। কাজের এক সপ্তাহের মধ্যে সেটি লাগিয়ে দেওয়া হবে এ কারণে কাগজে স্বাক্ষর করেছি।
কাজ সম্পূর্ণ না হওয়ার পরও কেন কাজ সম্পন্নের কাগজে স্বাক্ষর করা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, গ্রিল তৈরির অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং দ্রুত সেটি স্থাপন করা হবে বলেই তিনি স্বাক্ষর করেছেন।
অন্যদিকে, কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঠিকাদার শরিফুল ইসলাম বলেন, একটি গ্রিলের কাজ বাকি রয়েছে। বিল তুলেছি, সমস্যা কী? আমার সিকিউরিটি মানি জমা রয়েছে। এরপরও আমি গ্রিল বানাতে দিয়েছি।
তবে গ্রিল সরবরাহকারী শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ঠিকাদার শরিফুল ইসলাম তার কাছ থেকে প্রায় ৩৫০ কেজি গ্রিলের মালামাল নিয়েছেন। মালামালের মোট মূল্য ৪২ হাজার টাকা হলেও তাকে ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এখনো ১৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।
শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি সব মালামাল ঠিকভাবে সরবরাহ করেছি। আমার বিল পরিশোধ না করেই ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানে এখনো একটি গেট ও একটি গ্রিল প্রয়োজন। সেগুলো তৈরি করা হয়নি।
এ বিষয়ে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মন্ডল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জানান, তিনি ১৪ লাখ ২৪ হাজার টাকার কাজটি পেয়েছিলেন। পরে পাকুল্লা ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম তার কাছ থেকে ৫ শতাংশ লাভের বিনিময়ে কাজটি নেন।
কাজটি যিনি বাস্তবে করছেন তার ঠিকাদারি লাইসেন্স আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ডল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী বলেন, লাগে না, এরকম অনেক কাজেই বিক্রি হয়।
কাজ সম্পূর্ণ না করেই বিল উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, হ্যাঁ, ওটা তো প্রধান শিক্ষক দায়ী। আমি তো বলিনি কাজ শেষ না করে কাজ হ্যান্ডওভার করতে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়ের সভাপতি এবং ফ্যাসিলিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা তাকে ফোন করে কাজ সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন। তবে তার দাবি, ঠিকাদারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জামানত জমা থাকায় প্রয়োজনে ওই টাকা থেকে অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শেষ না করে বিল প্রশ্ন উঠছে নিয়ম মানা নিয়ে। উন্নয়নকাজের নির্ধারিত অংশ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর দেওয়া এবং ঠিকাদারি কাজ অন্যের মাধ্যমে করানোর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের অসম্পূর্ণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি, কাজের পরিমাণ, বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষর সবকিছু যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বগুড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি জানার পর আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং প্রধান শিক্ষককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে এসেছি। পাশাপাশি মূল ঠিকাদারকেও অফিসে ডেকে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার আগামী সাত দিনের মধ্যে বিদ্যালয়ের দুটি গ্রিল স্থাপন ও রংয়ের কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন না করলে বিধি অনুযায়ী ঠিকাদারের জামানতের টাকা বাজেয়াপ্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Post a Comment