Top News

সোনাতলায় মাদকবিরোধী তৎপরতাকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সংঘর্ষ

 


ছবি:এ আই

সোনাতলা (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার সোনাতলায় মাদকবিরোধী তৎপরতাকে কেন্দ্র করে একাধিক হামলা, মারপিট, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার শালিখা গ্রামে কয়েকজন যুবকের মাদকবিরোধী তৎপরতার জের ধরে প্রথমে সন্দেহভাজন মাদকসেবীদের আটক ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। এরপর বিরোধ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায়। এ ঘটনায় মাদকবিরোধী তৎপরতায় জড়িত তিন যুবকও হামলার শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঘটনাপ্রবাহে শালিখা গ্রামের রিজন তালুকদার সাদা (৩৮) ও তার ছোট ভাই রাকিব তালুকদার সুরিতের (৩২) বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠে। তবে তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোনাতলা সদর ইউনিয়নের কাবিলপুর গ্রামের হিরা নামের এক যুবকের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। পরে ওই বিরোধ সোনাতলা পৌর এলাকার একটি মোবাইল সার্ভিসিং দোকান পর্যন্ত গড়ায়।

এদিকে শালিখা গ্রামে সাদা ও সুরিতের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ করেছেন তাদের বাবা নজরুল ইসলাম তালুকদার ওরফে চুন্নু (৭৩)।

চুন্নু তালুকদার গত ২৩ আগস্ট রাতে সোনাতলা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে তিনি নাহিদ ও রাইসুলসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬-৭ জনকে আসামি করার কথা উল্লেখ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, গত ২২ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে রামদা, চাইনিজ কুড়াল, কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অভিযুক্তরা তার বাড়িতে হামলা চালায়। তারা দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করে এবং বাড়িতে তাণ্ডব চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

চুন্নু তালুকদারের দাবি, হামলাকারীরা ওয়ারড্রবের ড্রয়ারের তালা ভেঙে চিকিৎসার জন্য রাখা নগদ ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে যায়। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ও মেয়ের ব্যবহৃত প্রায় আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার, যার আনুমানিক মূল্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ঘরের আসবাবপত্রের প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

চুন্নু তালুকদার নিজেকে ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী দাবি করে হামলার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন।


মাদকবিরোধী তৎপরতায় দুইযুবক নাহিদ ও রাইসুল লুটপাটের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, তার দুই ছেলে দীর্ঘদিন থেকে মাদক বিক্রি করে আসছে। ঘটনার সময় তার দুই ছেলেকে বাড়ি খোজাখুজি করা হয়েছে।


অপরদিকে স্থানীয়দের দাবি, শালিখা গ্রামের কয়েকজন যুবক বেশ কিছুদিন ধরে মাদকবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে আসছেন। রাতে বহিরাগত কেউ মাদক কেনাবেচার উদ্দেশ্যে গ্রামে প্রবেশ করলে তাদের বাধা দেওয়া এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করে মারধর করার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকদিন আগে বেদারুল নামে এক যুবককে মাদক কেনার অভিযোগে আটক করে মারধর করা হয়। এ সময় কাবিলপুর গ্রামের হিরা সেখানে গিয়ে বিষয়টি জানতে চাইলে তাকেও স্থানীয় কয়েকজন যুবক মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া অটোভ্যানযোগে যাওয়া মাদকবিরোধী তৎপরতায় যুক্ত জামিল ও জাকিল নামের দুই যুবকের পথরোধ করে বেদারুল মারধর করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে হামলার অভিযোগ

ঘটনার জের ধরে সোনাতলা পৌর এলাকার মাদ্রাসা মোড়ের রহমান মার্কেটে টুটুল নামে এক যুবকের মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।


আহত টুটুল বর্তমানে সোনাতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অভিযোগ, সন্ধ্যা ৭টার দিকে হিরাসহ ৮-১০ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তার দোকানে হামলা চালায়। এ সময় দোকানে ভাঙচুরের পাশাপাশি তাকে মারধর করা হয়।

টুটুল বলেন, কয়েকদিন আগে শালিখা গ্রামে বেদারুলকে মাদক কেনার অভিযোগে আটক করে স্থানীয় যুবকেরা মারধর করেছিলেন। ওই সময় হিরা সেখানে গিয়ে কথা বললে তাকেও স্থানীয়রা প্রতিহত করেন। তিনি ওই ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে ওই ঘটনার জেরেই তার দোকানে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন টুটুল।



অভিযোগ অস্বীকার করে হিরা বলেন, তিনি মোটরসাইকেলে করে শালিখা গ্রামের ওই রাস্তা দিয়ে সোনাতলায় ফিরছিলেন। এ সময় রাস্তার পাশে হৈচৈ শুনে সেখানে এগিয়ে যান। একটি ছেলেকে মারধর করতে দেখে তিনি ঘটনার কারণ জানতে চাইলে কয়েকজন তাকে অতর্কিতভাবে মারধর করেন।

হিরার দাবি, পরবর্তীতে সোনাতলা মাদ্রাসা মোড় এলাকায় টুটুলকে দেখতে পেয়ে তিনি সেদিন তাকে অন্যায়ভাবে মারধরের বিষয়ে জানতে চান। এ সময় তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও একপর্যায়ে মারপিট হয়। এতে তার হাতের আঙুলে আঘাত লেগে হাড়ে চিড় ধরেছে বলে দাবি করেন তিনি। বর্তমানে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে রয়েছেন বলেও জানান।

মাদক কারবারের অভিযোগ অস্বীকার সাদার

মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে রিজন তালুকদার সাদা বলেন, তাকে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত দেখিয়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, তার কাছে কখনো মাদক পাওয়া গেছে—এমন কোনো প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করা হোক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে তার বাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।

সাদা জানান, তিনি চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করতেন। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বন্ধ থাকায় তিনি বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাদের বাড়িতে কেন হামলা চালানো হয়েছে, তা তিনি বুঝতে পারছেন না বলেও জানান।



মধুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে গ্রামের যুবকেরা মাদক নির্মূলে কাজ করছেন। এর অংশ হিসেবে কয়েকদিন আগে মাদক কেনার অভিযোগে দুজনকে মারধরের ঘটনা ঘটেছিল। পরে অটোচালক জামিল ও জাকিল এবং সোনাতলা পৌর এলাকায় দোকান করা টুটুল নামে এক যুবককে মারধরের খবর তিনি পান। খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে টুটুলকে দেখে এসেছেন।

চেয়ারম্যান বলেন, মাদক নির্মূলের নামে হামলা, ভাঙচুর কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে সবাইকে বিরত থাকারও পরামর্শ দেন তিনি।


সোনাতলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ওই এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ ঘটনায় চুন্নু নামে একজন থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


স্থানীয়দের বক্তব্য, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগে ঘটনাটি শুধু একটি বাড়িতে হামলা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাদকবিরোধী তৎপরতা, সন্দেহভাজনদের মারধর, পরবর্তী প্রতিশোধমূলক হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

তবে চুন্নু তালুকদারের বাড়ি থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার লুটের অভিযোগ, মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে হামলা-ভাঙচুর এবং অন্যান্য মারপিটের ঘটনাগুলোর প্রকৃত সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী তৎপরতার নামে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Post a Comment

Previous Post Next Post